বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনকে রক্ষা করতে সরকার নিয়েছে কঠোর ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২৫–২৬ মৌসুমে সেন্টমার্টিনে সীমিত সময়ের জন্য পর্যটন চালু রাখা হলেও, ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী ৯ মাস দ্বীপে পর্যটক প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
সীমিত পর্যটন মৌসুম ও সরকারি পদক্ষেপ
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি পর্যটন মৌসুমে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রবাল প্রাচীর, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটক প্রবেশ বন্ধ থাকবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের কারণে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
পর্যটন মৌসুমের বিস্তারিত
চলতি শীতকালীন মৌসুমে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অনুমতি পাচ্ছেন।
নভেম্বর মাসে পর্যটকদের দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসতে হবে। এ সময় রাত্রিযাপনের অনুমতি নেই।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পর্যটকদের জন্য রাত্রিযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে জানুয়ারির শেষ দিকে জাহাজের টিকিট বুকিংয়ে ব্যাপক চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
বর্তমানে কক্সবাজারের নুনিয়াছড়া জেটি থেকে জাহাজ চলাচল করছে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও পলল জমার কারণে টেকনাফ রুট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ৩১ জানুয়ারির পর থেকে পর্যটক যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে ।
পরিবেশ সংরক্ষণের যৌথ অভিযান
সেন্টমার্টিনে পরিবেশ সুরক্ষায় কক্সবাজার জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ট্যুরিস্ট পুলিশ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
অভিযানকালে হোটেল, দোকান ও সৈকত এলাকা থেকে প্লাস্টিক, পলিথিন ও একক ব্যবহার্য সামগ্রী জব্দ করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালত ৪টি হোটেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৭৬ হাজার টাকারও বেশি জরিমানা করেছে।
এছাড়া সৈকতে যানবাহন চলাচল, যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা ও পরিবেশ দূষণকারী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
নৌবাহিনীর কৌশলগত উপস্থিতি
দ্বীপটির নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় সেন্টমার্টিনের চারপাশে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত টহল দিচ্ছে।
অত্যাধুনিক রাডার ও যুদ্ধজাহাজ ব্যবহার করে দিন-রাত সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। সমুদ্রসীমা সুরক্ষা ও যেকোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় নৌবাহিনী সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
টেকসই ভবিষ্যতের মাস্টার প্ল্যান
সরকার সেন্টমার্টিনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান প্রণয়ন করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বীপটিকে চারটি জোনে ভাগ করা হবে।
- রেস্ট্রিক্টেড জোন: সম্পূর্ণ প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকা, যেখানে প্রবাল প্রাচীর ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষিত থাকবে
- পর্যটন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকবে মাত্র ৪ কিলোমিটার এলাকায়
- আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা সুরক্ষা হবে মূল লক্ষ্য
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে সেন্টমার্টিনে পর্যটন হবে স্থানীয়কেন্দ্রিক, নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব।