বাংলাদেশ–পাকিস্তান সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় শুরু

admin
By admin
4 Min Read

দীর্ঘ ১৪ বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু হওয়ায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো দক্ষিণ এশিয়ার আকাশপথে। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি যাত্রীবাহী বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে করাচির জিন্নাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করলে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ঐতিহ্যবাহী গ্র্যান্ড ওয়াটার স্যালুট দিয়ে বিমানটিকে বরণ করে নেয়

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এই ফ্লাইটে প্রায় দেড় শতাধিক যাত্রী ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে ব্যবসায়ী, কূটনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ও পারিবারিক সফরকারীরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার যাত্রা শেষে বিমানটি করাচি বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

বিমানবন্দর সূত্র জানায়, অবতরণের পরপরই রানওয়েতে দুই দিক থেকে পানি ছিটিয়ে ওয়াটার ক্যানন স্যালুট দেওয়া হয়। এ সময় বিমানবন্দরের টার্মিনালে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন প্রতিনিধিরা।

কেন বন্ধ ছিল সরাসরি ফ্লাইট

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এক সময় নিয়মিত সরাসরি বিমান চলাচল থাকলেও ২০১২ সালের পর ধীরে ধীরে তা বন্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক অচলাবস্থা, কূটনৈতিক দূরত্ব, যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যিক সম্ভাবনা হ্রাস—এই সব কারণেই দীর্ঘ সময় সরাসরি ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হয়নি।

ফলে বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানগামী যাত্রীদের মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অন্য তৃতীয় দেশের বিমানবন্দর হয়ে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে ভ্রমণ করতে হতো।

কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন বার্তা

সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু হওয়াকে কেবল একটি পরিবহন সেবা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশ–পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, বাণিজ্য আলোচনার পুনরুজ্জীবন এবং জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, এই ফ্লাইট তারই বাস্তব প্রতিফলন।

ফ্লাইট সূচি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে ঢাকা–করাচি রুটে সপ্তাহে দুইটি সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যাত্রী চাহিদা ও বাণিজ্যিক সফলতার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেলে এটি স্থায়ী রুট হিসেবে চালু করা হবে।

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

সরাসরি ফ্লাইট চালুর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও জোরদার হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী মহল। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য, চামড়া ও আইটি খাতে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য পাকিস্তানে নতুন বাজার তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের শিল্পপণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতেও সুবিধা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। সরাসরি বিমান যোগাযোগ থাকলে ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের যাতায়াত সহজ হবে, সময় ও খরচ উভয়ই কমবে।

যাত্রীদের প্রতিক্রিয়া

পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ফ্লাইট চালু হলে দুই দেশের পর্যটকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়বে। ঐতিহাসিক স্থান, ধর্মীয় পর্যটন ও চিকিৎসা পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে।

এছাড়া বহু পরিবার রয়েছে, যাদের আত্মীয়স্বজন দুই দেশে বসবাস করেন। তাদের জন্য এই সরাসরি ফ্লাইট একটি বড় স্বস্তি নিয়ে এসেছে।

ফ্লাইটের এক যাত্রী বলেন,
দীর্ঘদিন পর সরাসরি করাচি আসতে পেরে ভালো লাগছে। আগে মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে আসতে হতো, এতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি ছিল।

সব মিলিয়ে ১৪ বছর পর বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে সরাসরি বিমানের অবতরণ শুধু একটি ফ্লাইট নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার আকাশপথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কূটনীতি, বাণিজ্য, পর্যটন ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share This Article
Leave a Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *