ঢাকায় শুরু হয়েছে তিনদিনব্যাপী দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চ শিক্ষা সম্মেলন SARCHE 2026 (South Asian Regional Conference on Higher Education)। বৃহস্পতিবার রাজধানীর একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস। সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের শিক্ষা বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
এই সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হলো—দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবন জোরদার করা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস বলেন,
উচ্চশিক্ষা শুধু ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান হাতিয়ার। দক্ষিণ এশিয়ার মতো জনবহুল অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও মানবিক, উদ্ভাবনী এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সামাজিক বৈষম্য—এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সম্মেলনের মূল বিষয়বস্তু
SARCHE 2026 সম্মেলনে মোট ১২টি প্লেনারি সেশন, ২০টির বেশি কারিগরি সেশন এবং একাধিক প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে
- উচ্চশিক্ষায় গুণগত মান ও অ্যাক্রেডিটেশন
- গবেষণা ও উদ্ভাবনে আঞ্চলিক সহযোগিতা
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার
- শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি ও সমতা
- জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
- শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক বিনিময় কর্মসূচি
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব আলোচনা দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষানীতিতে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
সম্মেলনে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (ADB) পর্যবেক্ষক দলও সম্মেলনে উপস্থিত রয়েছে।
ভারতের এক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য বলেন,
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণায় সহযোগিতা বাড়লে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এই অঞ্চল অনেক এগিয়ে যেতে পারবে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিশেষ আলোচনা
সম্মেলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বক্তারা বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, তবে এখন প্রয়োজন মান নিশ্চিতকরণ, গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের পাঠক্রম উন্নয়ন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সরকার উচ্চশিক্ষাকে আরও যুগোপযোগী করতে নীতিগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে
- বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার
- আন্তর্জাতিক যৌথ ডিগ্রি প্রোগ্রাম চালু
শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ
SARCHE 2026 সম্মেলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। আঞ্চলিক স্কলারশিপ, ক্রেডিট ট্রান্সফার সিস্টেম এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্পের বিষয়ে একাধিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।
একজন তরুণ গবেষক বলেন,
এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা শুধু আলোচনা নয়, বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করতে পারব।
প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ শিক্ষা
সম্মেলনের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা। বক্তারা বলেন, অনলাইন শিক্ষা, হাইব্রিড লার্নিং এবং AI-ভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি উচ্চশিক্ষার চেহারা বদলে দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে ডিজিটাল বৈষম্য দূর করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
অধ্যাপক ইউনুস এ প্রসঙ্গে বলেন,
প্রযুক্তি যেন বৈষম্য না বাড়ায়, বরং সুযোগ সৃষ্টি করে—এটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনদিনব্যাপী এই সম্মেলনের শেষ দিনে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র (ঢাকা ডিক্লারেশন) প্রকাশের কথা রয়েছে। এতে দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষা উন্নয়নে করণীয়, নীতিগত সুপারিশ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, SARCHE 2026 শুধু একটি সম্মেলন নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।