যশোরের শার্শা উপজেলার উলাশি নামটি গ্রামীণ উন্নয়ন, স্বেচ্ছাশ্রম ও কৃষি বিপ্লবের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। প্রায় পাঁচ দশক আগে খনন করা উলাশি খাল এই অঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে যায়। এবার সেই ঐতিহাসিক খালকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আগামী সোমবার (২৭ এপ্রিল) উলাশি খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এই কর্মসূচি শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং অতীতের এক সফল উদ্যোগকে নতুন করে ফিরিয়ে আনার প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজ হাতে কোদাল তুলে নিয়ে খনন কার্যক্রমের সূচনা করবেন বলে জানা গেছে, যা অতীতের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উলাশি খাল খননের সূচনা করেন। তার এই প্রতীকী উদ্যোগ দ্রুতই স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে রূপ নেয়। হাজার হাজার মানুষ বিনা পারিশ্রমিকে স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নিয়ে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খনন সম্পন্ন করেন। এই খাল প্রায় ২২ হাজার একর জমিকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করে এবং কৃষিকাজে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।
খালের মাধ্যমে পাঁচটি বড় বিলের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে এবং সেচব্যবস্থা চালু হয়। খালের পাশে স্থাপিত পাম্পগুলোর সাহায্যে কৃষকরা সহজেই জমিতে পানি সরবরাহ করতে সক্ষম হন। ফলে ইরি ও বোরো ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং শার্শা উপজেলা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়।
তবে দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি ভরাট হয়ে পড়ে এবং পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে কৃষকরা আবারও জলাবদ্ধতা ও উৎপাদন হ্রাসের সমস্যায় পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে খাল পুনঃখননের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
স্থানীয় প্রবীণরা সেই সময়ের স্মৃতি এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের মতে, জিয়াউর রহমানের সরাসরি অংশগ্রহণ সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছিল, যা আজও উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
নতুন করে শুরু হতে যাওয়া এই পুনঃখনন কার্যক্রম স্থানীয়দের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে। তারা মনে করছেন, খালটি আবার সচল হলে কৃষিতে উৎপাদন বাড়বে এবং এলাকার অর্থনীতি নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে।
উলাশি খালের পুনর্জাগরণ তাই কেবল একটি উন্নয়ন প্রকল্প নয়—এটি একটি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, একটি স্বপ্নের পুনর্জন্ম এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার এক প্রতীকী উদ্যোগ।