যুক্তরাষ্ট্র সরকার সম্প্রতি তাদের অভিবাসন নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য মার্কিন ইমিগ্র্যান্ট ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, এই সিদ্ধান্ত ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।
এই ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস, পরিবার পুনর্মিলন কিংবা চাকরির উদ্দেশ্যে অভিবাসনের স্বপ্ন দেখেন এমন লাখো মানুষের পরিকল্পনায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে যাচ্ছে।

কোন ভিসাগুলো স্থগিত করা হচ্ছে?
এই সিদ্ধান্তের আওতায় মূলত ইমিগ্র্যান্ট ভিসা বা স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভিসাগুলো স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে
অর্থাৎ যারা যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করার পরিকল্পনা করছেন, তাদের ভিসা আবেদন আপাতত প্রক্রিয়াকরণ করা হবে না।
তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে জানা যায়, নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা যেমন—
এসব ভিসা সরাসরি এই স্থগিতাদেশের আওতায় পড়েনি। যদিও এসব ভিসার ক্ষেত্রেও কঠোর যাচাই-বাছাই ও বিলম্বের সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন এই সিদ্ধান্ত নিল যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে “Public Charge” নীতির কঠোর প্রয়োগ ও পুনর্মূল্যায়নের অংশ হিসেবে।
Public Charge বলতে বোঝানো হয়—
যেসব অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা বা কল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন, তাদের ভিসা দেওয়া হবে না।
এই নীতির আওতায় একজন ভিসা আবেদনকারীর ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করা হয়—
- আর্থিক সক্ষমতা
- বয়স ও শারীরিক অবস্থা
- শিক্ষাগত যোগ্যতা
- কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা
- যুক্তরাষ্ট্রে নিজ খরচে জীবনযাপনের সামর্থ্য
যুক্তরাষ্ট্র সরকার বলছে, তারা নিশ্চিত হতে চায় যে নতুন অভিবাসীরা যেন মার্কিন অর্থনীতির ওপর বোঝা না হন, বরং স্বনির্ভরভাবে বসবাস করতে পারেন।
কোন কোন দেশ এই তালিকায় রয়েছে?
যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ৭৫টি দেশের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেনি, তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায় যে এই তালিকায় রয়েছে—
সহ আফ্রিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তালিকায় থাকা দেশগুলোর বেশিরভাগই উন্নয়নশীল বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশ, যেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের হার তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশিদের ওপর প্রভাব
এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে পরিবারভিত্তিক ও কর্মসংস্থানভিত্তিক ইমিগ্র্যান্ট ভিসায়।
যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন—
- যাদের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে এবং তারা স্থায়ী ভিসার জন্য আবেদন করতে চেয়েছিলেন
- যারা গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী চাকরির সুযোগ খুঁজছিলেন
- যাদের ভিসা আবেদন ইতোমধ্যে প্রক্রিয়াধীন ছিল
এই আবেদনগুলো আপাতত অনিশ্চিত সময়ের জন্য স্থগিত থাকবে।
যাদের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি—
- শিক্ষার্থী
- পর্যটক
- স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণকারী
তবে তাদের ক্ষেত্রেও ব্যাংক স্টেটমেন্ট, স্পনসরশিপ ও আর্থিক কাগজপত্র আরও কঠোরভাবে যাচাই করা হতে পারে।
কতদিন চলবে এই স্থগিতাদেশ?
যুক্তরাষ্ট্র সরকার জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। পররাষ্ট্র দপ্তর অভিবাসন যাচাই-বাছাইয়ের নীতিমালা পুনর্মূল্যায়ন শেষ না করা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি কয়েক মাস থেকে শুরু করে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
এই সিদ্ধান্তের পর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে—
- এতে পরিবার পুনর্মিলন বাধাগ্রস্ত হবে
- বহু দক্ষ কর্মী যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারবেন না
- শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়বে
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সমর্থকরা বলছেন—
এই সিদ্ধান্ত দেশটির অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক হবে।