ইতালি সরকার ঘোষণা করেছে যে আগামী তিন বছর (২০২৬‑২০২৮) দেশের শ্রম বাজারের ঘাটতি পূরণে ধাপে ধাপে ৫০০,০০০ জন বিদেশী শ্রমিক নিয়োগ নেবে, যার মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকরা মূল লক্ষ্যবস্তু হিসেবে থাকবে। এটি আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও শ্রম সহযোগিতায় একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইতালির অভিবাসন নীতি ও বৈধ কর্মী নিয়োগ করণীয় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি তৈরি করা হয়েছে। ইতালিতে কাজের সুযোগ পেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের জন্য সরকার নির্ধারিত ক্লিক ডে আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে অনলাইনে আবেদন গ্রহণের প্রথম ধাপ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
কীভাবে হবে কর্মী নিয়োগ?
প্রথম ধাপে ইতালির কাজের ভিসার অনলাইন আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই এটি শেষ হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ভিসা যাচাইকরণ ও সাক্ষাৎকার এবং সর্বশেষ ধাপে নির্বাচিত কর্মীদের ইতালিতে পাঠানো হবে। ভিসা প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক শ্রম আইন ও অভিবাসন নীতিমালা মেনে বাস্তবায়ন করা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে ইতালি‑বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ ইতোমধ্যেই ইতালির সঙ্গে শ্রম বাজারে দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ নিয়ে আলোচনা করেছে।
কেন ইতালি?
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ইতালি ভূমধ্যসাগর উপকূলবর্তী অবস্থানের কারণে অভিবাসীদের প্রথম প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ এখানে বৈধ ও অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। ইতালি সরকার বৈধ পথের মাধ্যমে অভিবাসন ও কর্মসংস্থানের প্রস্তাব বাড়িয়ে অপরাধমূলক চ্যানেলগুলো কমাতে চাইছে।
ইতালিতে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখের বেশি বৈদেশিক নাগরিক কর্মী রয়েছে, যার ভিতর বাংলাদেশির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই ইতালিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস ও কাজ করছেন।
বিদেশি শ্রমিকদের ভূমিকা ও চাহিদা
ইতালির শ্রম বাজারে কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, গৃহসেবা ও পরিষেবা খাতে কর্মীর চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে বৃদ্ধ জন সংখ্যার কারণে সেবা খাতে যোগ্য ও দক্ষ শ্রমিকদের প্রয়োজনীয়তা তীব্র। এছাড়াও কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে মৌসুমী শ্রমিকদের চাহিদাও গত কয়েক বছরে বাড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে ইতালির শ্রম বাজারে বৈধ ও দক্ষ কর্মী সম্পদ বাড়বে এবং মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বৈধ অভিবাসন প্রচার পাবে।
বাংলাদেশে প্রত্যাশা ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশের ভোক্তা ও কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, এমন সুযোগ দেশটির তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈধভাবে বিদেশে কাজের সুযোগ পেলে কর্মীরা অধিক আয় করতে পারবেন এবং বৈদেশিক মুদ্রা রেমিট্যান্স সরবরাহ বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য সহায়ক হবে।
বাংলাদেশ সরকারও বর্তমানে দক্ষ শ্রমিক প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও উদ্যোগ চালু করছে। এর ফলে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাইরে ইউরোপীয় দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পাবে।
চ্যালেঞ্জ ও সিদ্ধান্ত
যদিও ইতালির সিদ্ধান্ত অনেকের জন্য ইতিবাচক, তথাপি অভিবাসন প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও নিরাপদ রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অতীতে অনিয়মিত অভিবাসন ও মানবপাচারের অভিযোগ থাকায় ইতালির পক্ষ থেকে কঠোর নিয়ম ও যাচাইকরণ চালু রাখা হয়েছে। ইতোপূর্বে ভিসা আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় দেরি এবং gridlock সৃষ্টি হওয়ায় বাংলাদেশি আবেদনকারীরা সমস্যায় পড়েছেন।
এতে সুষ্ঠু ও দালালমুক্ত ভিসা প্রক্রিয়া কার্যকর করা, পেশাগত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম চুক্তির মান বজায় রাখা ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের সফলতার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা।