দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একাধিক ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা নতুন করে সামনে এসেছে। টানা দুই বছর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য কোনো লভ্যাংশ ঘোষণা না করায় ১০টি ব্যাংকের শেয়ার ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমিত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-এর বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
পুঁজিবাজার সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) গত সপ্তাহের পর সর্বশেষ রোববার থেকে নতুন ক্যাটাগরি কার্যকর করে। এর আগে একই কারণে আরও তিনটি ব্যাংক ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে আসে। ফলে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় চলে গেছে।
নতুন করে অবনমিত ব্যাংকগুলো হলো— এবি ব্যাংক পিএলসি, আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি, ওয়ান ব্যাংক পিএলসি, প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, রূপালী ব্যাংক পিএলসি, এনআরবি ব্যাংক পিএলসি, মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি এবং এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি।
এর মধ্যে ছয়টি ব্যাংক আগে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে এবং চারটি ‘বি’ ক্যাটাগরিতে ছিল। পাশাপাশি আগেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, এসবিএসি ব্যাংক পিএলসি ও স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক পিএলসি একই কারণে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে আসে।
পুঁজিবাজারে ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার সাধারণত দুর্বল পারফরম্যান্স বা অনিয়মের ইঙ্গিত বহন করে। এই ক্যাটাগরির শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা মার্জিন ঋণ সুবিধা পান না। এছাড়া এসব শেয়ার কিনে তিন কার্যদিবসের আগে বিক্রি করা যায় না, যেখানে অন্যান্য ক্যাটাগরিতে এই সময়সীমা তুলনামূলক কম।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের বিধিনিষেধ বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও এটি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অবনমিত ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশই মুনাফা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
- এবি ব্যাংক ২০২৫ সালে বড় ধরনের লোকসানে পড়ে, শেয়ারপ্রতি লোকসান ৪৩ টাকার বেশি।
- আইএফআইসি ব্যাংকেও লোকসান বেড়েছে এবং সম্পদমূল্য কমে গেছে।
- ওয়ান ব্যাংকের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, যদিও এখনও সামান্য মুনাফা রয়েছে।
- প্রিমিয়ার ব্যাংক লাভ থেকে লোকসানে চলে গেছে।
- রূপালী ও এনআরবি ব্যাংকের আয় খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
- অন্যদিকে মার্কেন্টাইল, ইউসিবি, আল-আরাফাহ ইসলামী ও এনআরবিসি ব্যাংক কিছুটা মুনাফা করলেও তা লভ্যাংশ দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হয়নি।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংকগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা উচিত। কারণ লভ্যাংশ না দেওয়া শুধু আয় কমার ইঙ্গিত নয়, বরং ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
একজন বাজার বিশ্লেষক জানান, “ব্যাংক খাতে পরিচালন দুর্বলতা, ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি এবং ব্যবস্থাপনা সংকটের প্রভাব এখন স্পষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকগুলোর জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—আর্থিক পুনর্গঠন, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ কমানো এবং লাভজনকতা ফিরিয়ে আনা। অন্যথায় ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে, ব্যাংক খাতের এই পরিস্থিতি শুধু বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, পুরো আর্থিক ব্যবস্থার জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।