পবিত্র রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর ফরজ। তবে রোজা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কিছু প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরে ফিরে আসে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—সেহরি খাওয়ার পর যদি কেউ আলাদা করে নিয়ত না করেন, তাহলে তার রোজা কি সহি হবে?
ইসলামী শরিয়তে নিয়ত বা ইচ্ছা হলো যে কোনো ইবাদতের মৌলিক শর্ত। নামাজ, রোজা, হজ—সব ক্ষেত্রেই নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে নিয়ত মানেই যে মুখে উচ্চারণ করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং অন্তরের দৃঢ় সংকল্পই প্রকৃত নিয়ত হিসেবে বিবেচিত।
নিয়তের মূল বিষয় কী?
ফিকহবিদদের মতে, রমজানের রোজার ক্ষেত্রে নিয়ত অবশ্যই থাকতে হবে। কিন্তু সেই নিয়ত হৃদয়ে থাকলেই যথেষ্ট। অর্থাৎ কেউ যদি সেহরির জন্য ঘুম থেকে ওঠেন, খাবার গ্রহণ করেন এবং রোজা রাখার উদ্দেশ্যেই দিনের কার্যক্রম শুরু করেন—তাহলে সেটিই নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে।
মুখে নির্দিষ্ট দোয়া বা আরবি বাক্য উচ্চারণ করা সুন্নত বা মুস্তাহাব হতে পারে, কিন্তু তা ফরজ নয়। অনেকেই ধারণা করেন, নিয়তের নির্দিষ্ট বাক্য না পড়লে রোজা হবে না এ ধারণা সঠিক নয়।
কখন নিয়ত করতে হবে?
রমজানের ফরজ রোজার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে সুবহে সাদিক (ফজরের সময় শুরু) হওয়ার আগে নিয়ত করা উত্তম। তবে কিছু মাজহাবের মতে, দিনের প্রথমাংশে (যদি কেউ ভুলে নিয়ত না করে থাকেন) তখনও নিয়ত করা সম্ভব, শর্ত হলো ফজরের পর থেকে তখন পর্যন্ত কোনো রোজা ভঙ্গকারী কাজ না করা।
তবে অধিকাংশ আলেমের মতে, সেহরি খাওয়ার মধ্যেই নিয়ত সম্পন্ন হয়ে যায়, যদি ব্যক্তির উদ্দেশ্য থাকে রোজা পালন করা।
মুখে উচ্চারণের প্রয়োজন আছে কি?
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশে প্রচলিত একটি আরবি নিয়তের বাক্য অনেকেই পড়ে থাকেন। তবে ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে নিয়ত হলো অন্তরের বিষয়। হাদিসের আলোকে জানা যায়, সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ অন্তরের ইচ্ছাই এখানে মুখ্য।
কেউ যদি শুধু মনে মনে রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেই অনুযায়ী সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকেন, তাহলে তার রোজা সহি হবে ইনশাআল্লাহ।
সাধারণ ভুল ধারণা
অনেক সময় দেখা যায়, কেউ সেহরি খাওয়ার পর আবার ঘুমিয়ে পড়েছেন এবং আলাদা করে নিয়ত পড়েননি—এ কারণে তিনি দ্বিধায় ভোগেন। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, সেহরিতে অংশ নেওয়াটাই রোজার প্রস্তুতি এবং নিয়তেরই অংশ।
তবে যদি কেউ সেহরি না খেয়ে থাকেন এবং রোজা রাখার ইচ্ছাও স্পষ্টভাবে না করেন, তাহলে নিয়ত নিয়ে সন্দেহ দেখা দিতে পারে। তাই রোজার বিষয়ে সচেতন থাকা এবং অন্তরে দৃঢ় সংকল্প রাখা জরুরি।
সচেতনতা ও প্রস্তুতির গুরুত্ব
রমজান শুধুমাত্র পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম নয়; এটি আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের মাস। তাই নিয়তসহ প্রতিটি আমল সঠিকভাবে আদায় করা প্রয়োজন। আলেমরা পরামর্শ দেন, রোজা রাখার আগে মনে দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং রোজার উদ্দেশ্য স্মরণ রাখা উচিত।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সেহরির পর আলাদা করে মুখে নিয়ত না পড়লেও—যদি অন্তরে রোজা রাখার ইচ্ছা থাকে—তাহলে রোজা সহি হবে। নিয়ত হৃদয়ের বিষয়, উচ্চারণের নয়।
রমজানের প্রতিটি রোজা যেন শুদ্ধভাবে পালন করা যায়, সে জন্য ধর্মীয় বিষয়ে সঠিক জ্ঞান অর্জন ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।