বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, আছে হারানো, চুরি হওয়া ও অবিশ্বাস্যভাবে জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখার মতো নাটকীয় সব ঘটনা। এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো বিশ্বকাপ ট্রফিকে ঘিরে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে চমকপ্রদ ও অজানা গল্পগুলো।
ফুটবল বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস শুরু হয় ১৯৩০ সালে। প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের পর ফিফা একটি স্থায়ী ট্রফির সিদ্ধান্ত নেয়। সেই ট্রফির নাম ছিল জুল রিমে ট্রফি, ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুল রিমের নামে। সোনালি রঙের এই ট্রফিতে ছিল ডানাওয়ালা দেবী নাইকের প্রতিকৃতি, যিনি বিজয়ের প্রতীক।
এই ট্রফিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ট্রফিগুলোর একটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জুতার বাক্সের গল্প
News D24

বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাসের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য অধ্যায় আসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৩৯ সালে যুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নাৎসি বাহিনীর আগ্রাসনে বহু মূল্যবান শিল্পকর্ম ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংস বা লুট হয়ে যায়। তখন ইতালির দখলে ছিল জুল রিমে ট্রফি।
এই সময় ট্রফিকে রক্ষা করার দায়িত্ব নেন ইতালির ফুটবল কর্মকর্তা অত্তোরিনো বারাসি। নাৎসি বাহিনী যাতে ট্রফির সন্ধান না পায়, সে জন্য তিনি এক অভিনব কৌশল নেন। ট্রফিটি একটি সাধারণ জুতার বাক্সে ভরে নিজের বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখেন। বহু বছর পর জানা যায়, বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি ট্রফিটি যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে এক সাধারণ জুতার বাক্সেই নিরাপদে ছিল।
এই ঘটনা বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
লন্ডনে চুরি: বিশ্ব কেঁপে উঠেছিল
১৯৬৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করে ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপের আগেই লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয় জুল রিমে ট্রফি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে, প্রদর্শনী চলাকালীন ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়।
খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ইংল্যান্ড পুলিশ ব্যাপক তদন্ত শুরু করে, সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়—“বিশ্বকাপ ট্রফি উধাও!”
এক সপ্তাহ পর ঘটে নাটকীয় মোড়। লন্ডনের এক সাধারণ বাসিন্দার কুকুর, নাম পিকলস, হাঁটতে গিয়ে একটি ঝোপের ভেতর মোড়ানো প্যাকেট খুঁজে পায়। সেটি খুলতেই বেরিয়ে আসে হারিয়ে যাওয়া জুল রিমে ট্রফি। কুকুর পিকলস রাতারাতি জাতীয় নায়ক হয়ে ওঠে, আর তার মালিক পান মোটা অঙ্কের পুরস্কার।
ব্রাজিলের চিরবিদায় ও রহস্যময় চুরি
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে তারা ট্রফিটি স্থায়ীভাবে রাখার অধিকার পায়। ব্রাজিল ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০—এই তিনটি বিশ্বকাপ জেতার পর জুল রিমে ট্রফি স্থায়ীভাবে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
কিন্তু এখানেই শেষ নয় নাটক। ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরোর ফুটবল ফেডারেশনের অফিস থেকে ট্রফিটি আবারও চুরি হয়ে যায়। ধারণা করা হয়, চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে বিক্রি করে দেয়। আজ পর্যন্ত এই ট্রফির আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এভাবেই ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি চিরতরে হারিয়ে যায়।

রহস্যময় চুরি
নতুন বিশ্বকাপ ট্রফির আবির্ভাব
জুল রিমে ট্রফি হারিয়ে যাওয়ার পর ফিফা নতুন একটি ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয় বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। এটি ইতালীয় শিল্পী সিলভিও গাজানিগা ডিজাইন করেন।
১৮ ক্যারেট সোনায় তৈরি এই ট্রফিতে দুইজন মানবাকৃতির অবয়ব পৃথিবীকে ধরে রেখেছে—যা বিশ্ব ঐক্য ও বিজয়ের প্রতীক। উচ্চতায় ৩৬.৮ সেন্টিমিটার ও ওজনে প্রায় ৬.১ কেজি এই ট্রফিটি আজ বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ক্রীড়া ট্রফিগুলোর একটি।
আধুনিক যুগে ট্রফির কড়া নিরাপত্তা
আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন বিশ্বকাপ ট্রফির নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কঠোর। বিজয়ী দলকে আসল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে দেওয়া হয় না। তারা পায় একটি গোল্ড-প্লেটেড রেপ্লিকা।
আসল ট্রফিটি ফিফার তত্ত্বাবধানে সুইজারল্যান্ডে রাখা হয় এবং বিশ্বকাপ চলাকালীন কড়া নিরাপত্তায় বহন করা হয়। ট্রফি পরিবহনের সময় সশস্ত্র নিরাপত্তা, বিমা ও বিশেষ কন্টেইনার ব্যবহার করা হয়।
বিশ্বকাপ ট্রফির এই অবিশ্বাস্য গল্পগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল মাঠের ভেতরেই লেখা হয় না। যুদ্ধ, চুরি, রহস্য আর মানবিক সাহসিকতার মধ্য দিয়েও একটি ট্রফি হয়ে উঠতে পারে কিংবদন্তি।
জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখা সেই ট্রফি থেকে শুরু করে কুকুর পিকলসের হাতে উদ্ধার—এসব গল্প বিশ্বকাপকে দিয়েছে আরও মানবিক রূপ।
বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস মানেই শুধু শিরোপা জয়ের গল্প নয়। এটি সাহস, দায়িত্ব, রহস্য ও আবেগের এক অনন্য দলিল। কখনো জুতার বাক্সে লুকানো, কখনো চোরের কবলে পড়া—এই সব ঘটনাই বিশ্বকাপ ট্রফিকে করেছে আরও বেশি কিংবদন্তি।
আর তাই, যখনই কোনো অধিনায়ক ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে, তখন তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শত বছরের ইতিহাস, অজানা সব গল্প আর অগণিত মানুষের স্বপ্ন।