ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসেবে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য এসব ব্যাংকের আমানতের মুনাফা সাময়িকভাবে কেটে রাখার (হেয়ারকাট) সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। ফলে এ দুই বছরে আমানতকারীরা কোনো মুনাফা পাবেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ব্যাংক একীভূতকরণ রীতিনীতি অনুসরণ করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সংকটে পড়া বা পুনর্গঠনের আওতায় আসা ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের হেয়ারকাট একটি স্বীকৃত পদ্ধতি।
যেভাবে কার্যকর হবে হেয়ারকাট
যেসব আমানতকারী ইতিমধ্যে ২০২৪ ও ২০২৫ সময়কালের মুনাফা তুলে নিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সেই সমপরিমাণ অর্থ মূল আমানত থেকে কেটে রাখা হবে। আর যাঁরা মুনাফা উত্তোলন করেননি, তাঁরা এ সময়ের কোনো মুনাফা পাবেন না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখার ফলে পাঁচ ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার দায় কমবে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত ছিল প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে তা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। হেয়ারকাট কার্যকর হলে আমানতের পরিমাণ নেমে আসতে পারে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকায়।
এই পাঁচ ব্যাংকে আনুমানিক ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন বলে জানা গেছে।
একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো
- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
- ইউনিয়ন ব্যাংক
- গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
- এক্সিম ব্যাংক
- সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
একীভূত ব্যাংকের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। চলতি সপ্তাহেই এই নিয়োগ সম্পন্ন হতে পারে। এরপর উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা, কোম্পানি সচিবসহ শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়া হবে।
পাঁচ ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই, তাঁদের নতুন ব্যাংকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যদের ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে।
এ ছাড়া পাঁচ ব্যাংকের সম্পদ ও দায় একীভূত করতে একটি সমন্বিত সফটওয়্যারে তথ্য স্থানান্তরের কাজ চলবে। নতুন ব্যাংক ধীরে ধীরে নতুন আমানত সংগ্রহ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণে যাবে। সব গ্রাহককে নতুন হিসাব নম্বর ও চেক বই দেওয়া হবে। পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে।
মূল চ্যালেঞ্জ কোথায়
নতুন ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও খেলাপি ঋণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে নতুন পণ্য ও আধুনিক বিপণন কৌশল গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
মূলধন কাঠামো ও সরকারের ভূমিকা
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন হবে ৪০ হাজার কোটি টাকা, পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগান দেবে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অর্থ শেয়ারে রূপান্তরের মাধ্যমে যুক্ত হবে।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের অর্ধেক সদস্য হবেন স্বতন্ত্র পরিচালক। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, তিন বছর পর সরকার ধীরে ধীরে ব্যাংকটির শেয়ার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেবে এবং বিনিয়োগ করা মূলধন ফেরত নেবে।
বিশেষজ্ঞদের মত
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরির মতে, ব্যাংক একীভূতকরণ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সংস্কার উদ্যোগ। তবে তাঁর প্রশ্ন—যাঁরা ব্যাংকগুলো সংকটে ফেলেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো এবং কত টাকা উদ্ধার করা গেল।
তিনি মনে করেন, পুরোপুরি পেশাদার ব্যাংকারদের দিয়ে পরিচালনা করা গেলে নতুন ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় এটি যেন সাধারণ সরকারি ব্যাংকের মতো অকার্যকর কাঠামোতে আটকে না পড়ে—সেদিকে নজর দিতে হবে।